নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
লক্ষ্য একটাই—আদিবাসী তালিকাভুক্তি, কিন্তু সেই লক্ষ্যপূরণের পথ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভক্ত কুড়মি সমাজ। রাজ্যে বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই পক্ষের অবস্থানই আপাতত রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে।
দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিরোধের পরও ‘তৃণমূলকে একটি ভোটও নয়’ অবস্থান থেকে সরেনি আদিবাসী কুড়মি সমাজ। সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, আদিবাসী তালিকাভুক্তির দাবিতে যাঁরা কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন, তাদের পক্ষেই থাকবে তারা। পাশাপাশি স্পষ্ট করা হয়েছে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তারা নিজেরা কোনো প্রার্থী দেবে না। নির্বাচনী আচরণবিধি জারি হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সংগঠনের প্রধান নেতা অজিত প্রসাদ মাহাতো জানান, “কেন্দ্র যদি কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে বিজেপিকে সমর্থনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে”।
অন্যদিকে, আদিবাসী কুড়মি সমাজের পালটা হিসেবে গঠিত হয়েছে ‘কুড়মি যৌথ মঞ্চ’। শনিবার বাঁকুড়ার সিমলাপালের হরিণটুলিতে ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ, পূর্বাঞ্চল আদিবাসী কুড়মি সমাজ ও বাইসি কুটুম মিলিতভাবে এই মঞ্চ গঠন করে। তাদের দাবি, কুড়মি জনজাতিদের আদিবাসী তালিকাভুক্তির বিষয়টি তৃণমূল কংগ্রেসকে নির্বাচনী ইস্তাহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, নচেৎ তারা শাসকদলের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেবে।ইতিমধ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে যৌথ মঞ্চ। পাশাপাশি ১১ মার্চ পুরুলিয়া শহরে বৃহৎ জনসভার ডাক দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, আদিবাসী কুড়মি সমাজের তৃণমূল বিরোধিতার পালটা হিসেবে গড়ে ওঠা যৌথ মঞ্চও কেন শাসকদলের উপর চাপ তৈরি করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, কুড়মি জনজাতির গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলিকে পুরোপুরি পাশে না পাওয়ার কারণেই কি শাসকদলের উদ্দেশে এমন কড়া বার্তা— সেই জল্পনাই এখন জোরালো।
অন্যদিকে আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল দাবিকে সামনে রেখেই তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেন আন্দোলনের অন্যতম মুখ অজিতপ্রসাদ মাহাতো। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার একাধিকবার দাবি পূরণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। কুড়মি সমাজের তরফে বারবার কমেন্ট–জাস্টিফিকেশন পাঠানোর দাবি জানানো হলেও রাজ্য তা করেনি। সেই কারণেই রেল অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচির পথে হাঁটতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
অজিতপ্রসাদের বক্তব্য, এই প্রেক্ষিতেই ‘তৃণমূলকে একটি ভোটও নয়’—এই ডাক দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান অবস্থানে কুড়মি সমাজের দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয় বলেই ইঙ্গিত। তাঁর কথায়, রাজ্যে নির্বাচনী বিধি চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত যে রাজনৈতিক দল কুড়মি সমাজের দাবি পূরণে স্পষ্টভাবে সমর্থন জানাবে, তার পাশেই তাঁরা দাঁড়াবেন। তৃণমূল বা বিজেপি—কেউই যদি এই দাবি নিয়ে মুখ না খোলে, আর তৃতীয় ফ্রন্ট এগিয়ে আসে, তবে তাদের সমর্থন করতেও তাঁরা প্রস্তুত।
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, কেন্দ্র সরকার যদি কুড়মালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফশিলে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে বিজেপির পাশেই থাকবে কুড়মি সমাজ। তবে আসন্ন সময়ে কুড়মি সমাজ কোনও নির্বাচনে প্রার্থী দেবে না বলেও জানিয়ে দেন তিনি। রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়া বা না দেওয়ার প্রশ্নে একমাত্র মাপকাঠি থাকবে আদিবাসী স্বীকৃতি ও ভাষার দাবি—এটাই তাঁদের চূড়ান্ত অবস্থান বলে জানান আন্দোলনের নেতৃত্ব।










Post Comment