নিজস্ব প্রতিনিধি,মানবাজার:
এক সময় নিজের নামটুকু লিখতে পারতেন না। ব্যাংকে গেলে আঙুলের ছাপই ছিল ভরসা। আজ সেই মানুষগুলিই খাতায় কলম চালিয়ে নিজের নাম, ঠিকানা, এমনকি দৈনন্দিন হিসাব লিখে ফেলছেন অনায়াসে। পুরুলিয়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে এমনই এক সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে জঙ্গলমহল।
মানবাজার–১ ও ঝালদা–১ ব্লকের বিভিন্ন গ্রামে গত ১৬ মাস ধরে চলা বয়স্ক সাক্ষরতা কর্মসূচি শুধু পড়তে-লিখতে শেখাচ্ছে না—শেখাচ্ছে নিজের অধিকার বোঝা, আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়া এবং আত্মনির্ভর হওয়ার পথ। এই উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে আমেরিকার মাউন্ট এরি রোটারি ক্লাব ও পুরুলিয়া রোটারি ক্লাব। হ্যানসন পরিবারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক প্রকল্পে ইতিমধ্যেই ৫৬৭ জন বয়স্ক পুরুষ ও মহিলা সাক্ষরতার আলোয় আলোকিত হচ্ছেন।
গোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আর.এস.আর. বিদ্যাপীঠের তত্ত্বাবধানে জেলার ৫০টি সাক্ষরতা কেন্দ্রে প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে জীবনের গল্প। কেউ শিখছেন নিজের নাম লেখা, কেউ আবার প্রথমবার বুঝতে পারছেন সরকারি প্রকল্পের ফর্ম কীভাবে পূরণ করতে হয়। অনেকের কাছেই এটি জীবনের প্রথম শ্রেণিকক্ষ।
এই সামাজিক রূপান্তরকে সামনে থেকে দেখতেই সম্প্রতি গোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজির হন আমেরিকার মাউন্ট এরি রোটারি ক্লাবের ১৪ জন প্রতিনিধি। আধুনিক পঠন-পাঠন পদ্ধতি, ডিজিটাল শিক্ষার ব্যবহার এবং গ্রামীণ স্কুলের আন্তরিক পরিবেশ দেখে তাঁরা অভিভূত হন। তাঁদের মতে, সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেও যে উদ্ভাবনী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, গোবিন্দপুর তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রছাত্রীদের সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল শ্রেণিকক্ষের বাইরে—সেই বয়স্ক শিক্ষার্থীরা, যাঁদের চোখে এখন আর দ্বিধা নয়, বরং শেখার আগ্রহ।
শুধু শিক্ষা নয়, মানবিক সহানুভূতির দিকটিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে এই কর্মসূচিতে। বিভিন্ন সাক্ষরতা কেন্দ্র পরিদর্শনের পাশাপাশি পড়ুয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয় চাদর, জুতো ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। শুঁড়িগোড়া গ্রামে ৬০ জন বয়স্ক আদিবাসী নারী-পুরুষকে চাদর প্রদান করা হয়, যা এই উদ্যোগের সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টান্ত।
এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে বিদেশি প্রতিনিধিরা পাঠদানের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট—এটি শুধুই একটি শিক্ষা প্রকল্প নয়, বরং সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এক বৈশ্বিক প্রয়াস।
ড. পল মাহাতোর নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন মিচেল মারিয়া যোশেফ, মার্গারেট অ্যালান ক্লে, খাতিতা মোনিক এমারসন, কাইথ ক্যামেরুন গর্ডন, ডেবরহ আন মোরনে, বারবারা এলাইনে ক্যানক্রায়ন ফ্লোরেস, কারলেটা এলেন, হুইটনি এলিজাবেথ লি হান, সুসান বাটলার গর্ডন, পিটার রবিন ক্লে, প্যাটরিকা বেনান-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। পুরুলিয়া রোটারি ক্লাবের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন কুনাল রাজগোড়িয়া, অমিতাভ লোহারিওয়াল, রাজকুমার শীল এবং স্বামী ভাস্করানন্দ।
পুরুলিয়ার মাটিতে এই সাক্ষরতা আন্দোলন প্রমাণ করছে—শিক্ষার কোনো বয়স হয় না। সুযোগ পেলে, সমর্থন পেলে, আজও বদলে যেতে পারে শত শত জীবনের ভবিষ্যৎ।










Post Comment