নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া :
সাম্মানিক বৃদ্ধি সহ একাধিক দাবিতে রাজ্য জুড়ে চলা আশা কর্মীদের কর্মবিরতি শুক্রবার চতুর্থ দিনে পড়ল। এরই মধ্যে পুরুলিয়ায় জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ও জেলাশাসক কার্যালয়ের সামনে টানা ধর্না-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠল প্রশাসনিক এলাকা। পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়নের ডাকে এই আন্দোলনে শামিল হন জেলার বিভিন্ন ব্লকের শতাধিক আশা কর্মী।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শুক্রবার সকাল প্রায় ১১টা নাগাদ সংগঠনের পুরুলিয়া জেলা কমিটির নেতৃত্বে জেলার ২০টি ব্লক থেকে আসা শতাধিক আশা কর্মী প্রথমে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের দপ্তরের সামনে ধর্না অবস্থানে বসেন। দুপুর ১টা পর্যন্ত ধর্না চলার পর প্রতিনিধিদল সিএমওএইচ-এর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। এরপর জেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ অবস্থান শুরু হয়।
বর্তমানে মাসিক মাত্র ৫২৫০ টাকা সাম্মানিকে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ আশা কর্মীদের। তাদের দাবি, এই সাম্মানিক বাড়িয়ে মাসিক ১৫ হাজার টাকা করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত মেটাতে হবে দীর্ঘদিনের বকেয়া উৎসাহ ভাতা ও অন্যান্য ইনসেন্টিভ।
আন্দোলনরত আশা কর্মীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম ভাতা, ছুটি ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত থেকেও তারা গ্রামবাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করে চলেছেন। কিন্তু সরকার তাদের ন্যায্য প্রাপ্য দিতে ব্যর্থ।
আশা কর্মীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি—
কর্মরত অবস্থায় কোনো আশা কর্মীর মৃত্যু হলে তার পরিবারকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এছাড়াও—চার মাসের বকেয়া উৎসাহ ভাতা অবিলম্বে প্রদান।
সমস্ত বকেয়া ইনসেন্টিভ ও পিএলআই-এর টাকা মেটানো। মোবাইল কেনা ও ব্যবহারে শর্ত চাপানো বন্ধ।
প্রতি মাসে নিয়মিত ফুল রিচার্জ প্যাক প্রদান।
সরকার ঘোষিত সমস্ত ছুটি কার্যকর করা বছরে ২৪ দিনের ক্যাজুয়াল লিভ ও ৩০ দিনের মেডিকেল লিভ।
মেটারনিটি লিভ ১৮০ দিনে বাড়ানো। কেন্দ্র ঘোষিত ইনসেন্টিভ দ্রুত কার্যকর করা। ধাপে ধাপে ইনসেন্টিভ দেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল।
বিক্ষোভ চলাকালীন ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের একাধিক সরকারি সার্কুলার পুড়িয়ে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রাজ্য সরকারের ঘোষিত বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কাজ করা আশা কর্মীদের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে। সংগঠনের জেলা সভানেত্রী সুস্মিতা মাহাতো বলেন, “ফাইলেরিয়া, লেপ্রোসি কিংবা পালস পোলিও সমীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির জন্য আমাদের ৭৫ টাকায় কাজ করতে বলা হচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য ভবনের নথি অনুযায়ী প্রতিটি কাজের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০০ টাকা। এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তার কোনও জবাব নেই। এই বৈষম্যের প্রতিবাদেই আমরা সরকারি সার্কুলার পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি।” গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে রাজ্য জুড়ে শুরু হওয়া এই কর্মবিরতির ফলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের একাধিক কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। এই কর্মবিরতির ফলে পুরুলিয়ার গ্রামীণ এলাকায় টিকাকরণ, অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের নজরদারি, শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পুরুলিয়ার জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অশোক বিশ্বাস বলেন,
“আশা কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই কর্মবিরতিতে সকল আশা কর্মী অংশগ্রহণ করেননি। একটি সংগঠন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এই আন্দোলন চালাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।” আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—দাবি পূরণ না হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও বৃহত্তর ও তীব্র রূপ নেবে। একদিকে যেমন ন্যায্য দাবিতে অনড় আশা কর্মীরা, অন্যদিকে স্বাস্থ্য পরিষেবা সচল রাখার চ্যালেঞ্জ—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা জেলা।











Post Comment