নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝালদা :
আবারও ক্যালেন্ডারে ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু এই দিনটি পুরুলিয়ার ঝালদা সংলগ্ন অযোধ্যা পাহাড় এলাকার মানুষের কাছে শুধু একটি তারিখ নয়—এ এক দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি। বাঘবিন্ধা, চিরুটাড়, গুটিলৌয়া, নৌয়াগড়—এই পাহাড়তলি গ্রামগুলিতে আজও থমকে যায় সময়। ১৫ বছর আগের সেই রক্তাক্ত সন্ধ্যার স্মৃতি এখনও মানুষকে তাড়া করে ফেরে।
২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সন্ধ্যা নামতেই এলাকায় হঠাৎ হাজির হয় সশস্ত্র মাওবাদীরা। জলপাই রঙের পোশাক, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র—মুহূর্তের মধ্যেই বোঝা যায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা। বসে তথাকথিত ‘গণ আদালত’। সেই রাতেই ফরওয়ার্ড ব্লকের সাতজন কর্মীকে একে একে হত্যা করা হয়। পাহাড়ের কোলে নেমে আসে মৃত্যু আর নিস্তব্ধতা।
গণহত্যার পর আতঙ্কের মাত্রা এতটাই ছিল যে, সেদিন রাতে ঝালদা থানার পুলিশও এলাকায় ঢোকার সাহস পায়নি। পরদিন ভোরে বিশাল পুলিশ বাহিনী গিয়ে মৃতদেহগুলি উদ্ধার করে। কিন্তু প্রশাসনের উপস্থিতির আগেই গ্রামগুলিতে ঢুকে পড়েছিল দীর্ঘস্থায়ী ভয়।
১৫ বছর কেটে গেলেও সেই ভয় কাটেনি। এখনও বহু পরিবার কথা বলতে চায় না বাইরের কারও সঙ্গে। কেউ কেউ আজও গ্রামছাড়া। পাহাড়তলির মানুষের জীবনে ১৬ ডিসেম্বর মানেই হারানোর দিন।
প্রতিবছরের মতো এ বছরও বাঘবিন্ধা গ্রামে স্মরণ সভার আয়োজন করে ফরওয়ার্ড ব্লক। সভামঞ্চ থেকে গ্রামটির নাম ‘সপ্তশহীদ গ্রাম’ হিসেবে নামকরণের প্রস্তাব তোলা হয়। শহীদদের স্মরণে নীরবতা আর শোকের আবহে গোটা এলাকা।
লম্বোধর সিং, শহীদ পরিবারের সদস্য বলেন,
“১৫ বছর হয়ে গেল, কিন্তু সেই রাতের কথা ভুলতে পারিনি। আজও মনে হয়, আবার বুঝি সবকিছু ফিরে আসবে। আমরা শুধু চাই—এই ত্যাগ যেন ভুলে না যায় কেউ।”
ধীরেন মাহাত, ফরওয়ার্ড ব্লক পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য বলেন,
“এই সাতজন শহীদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আজকের ইতিহাস। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম জানুক—কীভাবে এই পাহাড়তলি অঞ্চল সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিল।”
আজ মাওবাদীদের আর প্রকাশ্য আনাগোনা নেই। কিন্তু স্মৃতি আছে। আতঙ্ক আছে। আর আছে পাহাড়তলির মানুষের নীরব আর্তনাদ—যা আজও শোনা যায় ১৬ ডিসেম্বর এলেই।











Post Comment