insta logo
Loading ...
×

ভেনিসে সেরা পরিচালক পুরুলিয়ার অনুপর্ণার জয়ে গর্বিত বাংলা

ভেনিসে সেরা পরিচালক পুরুলিয়ার অনুপর্ণার জয়ে গর্বিত বাংলা

সুজয় দত্ত , পুরুলিয়া:

পুরুলিয়ার কপালে এখন তুঙ্গে বৃহস্পতি। শিক্ষা ক্ষেত্রে দেশ রাজ্যের সেরা হচ্ছে ছেলে মেয়েরা, পুরুলিয়ার ছেলে সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ করে ফিরছে আর এবার চলচ্চিত্রের পর্দায় বিশ্বজয় করলেন পুরুলিয়ার মেয়ে। পুরুলিয়ার ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া যাত্রা এবার পৌঁছাল ইতালির ভেনিসে। ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ৮২তম সংস্করণের ‘অরিজন্টি’ বিভাগে সেরা পরিচালকের সম্মান জিতে নিলেন পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা রায়। তাঁর ছবি Songs of Forgotten Trees এনে দিল এই গৌরব। শনিবার রাতে ঘোষিত পুরস্কার যেন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়— গর্বে ভরিয়ে তুলল গোটা জেলা, বাংলা, দেশকে।

খনি অঞ্চলের নিতুড়িয়ার সরবড়ি গ্রাম লাগোয়া নারায়ণপুরের বাড়িতে বড় হওয়া মাম্পিকে আজ সারা দুনিয়া চেনে পরিচালক অনুপর্ণা নামে। কর্পোরেট জগতের মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে যখন পুরুলিয়ার অজ পাড়া গাঁয়ের লোকেশনে সিনেমা বানাতে নামলেন, তখনই বাবা ব্রহ্মানন্দ রায় খানিকটা রসিকতা, খানিকটা অবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন, ‘‘সত্যজিৎ রায় হবি?’’ মেয়ের উত্তর ছিল অকপট— ‘‘হতে পারব না হয়তো। তবে সিনেমা বানিয়ে বিদেশ থেকে পুরস্কার নিয়ে ফিরব।’’ কথাটা আজ হুবহু সত্যি হল।

পুরস্কার গ্রহণের সময় সাদা শাড়ি পরে মঞ্চে উঠেছিলেন অনুপর্ণা। হাতে ট্রফি নিয়েই বললেন, ‘‘এ মুহূর্ত সত্যিই অবিশ্বাস্য। ভেনিসের মতো এক বড় ফেস্টিভ্যালে দাঁড়িয়ে আছি— ভাবতেই কেমন লাগছে। সবচেয়ে আগে ধন্যবাদ জানাই জুরি, দর্শক আর ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষকে। কৃতজ্ঞ আমার প্রযোজকের কাছে, যিনি এমন এক ছবিতে ভরসা করেছিলেন, যা প্রচলিত ধারার ছক ভেঙেছে। শুরু থেকেই অনুরাগ কাশ্যপ বিশ্বাস রেখেছিলেন এই কাজে।’’
ফরাসি পরিচালক ও অরিজন্টি বিভাগের জুরি প্রেসিডেন্ট জুলিয়া ডুকুরনো তাঁর হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন। আবেগে ভরা কণ্ঠে অনুপর্ণা ঘোষণা করেন, ‘‘বাংলাকে ধন্যবাদ জানাব। এটা পুরুলিয়ার জয়।’’

সেই গর্বে চোখ ভিজে উঠেছে পরিবারেরও। পশ্চিম বর্ধমানের কুলটির ফ্ল্যাটে বসে অবসরপ্রাপ্ত ইসিএল কর্মী ব্রহ্মানন্দ রায়ের গলায় গর্ব, ‘‘অকল্পনীয়! সত্যিই পুরুলিয়ার মেয়ে বিদেশ থেকে পুরস্কার নিয়ে ফিরছে।’’ অন্যদিকে আমডিহায় থাকা মামা নীলোৎপল সিংহের আবেগ, ‘‘রবিবার সকালে ফোন করতেই আমরা তিনজন একসঙ্গে কেঁদে ফেললাম।’’

অথচ এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে লড়াইয়ের ইতিহাস। নিতুড়িয়ার রানিপুর হাইস্কুলের ছাত্রী অনুপর্ণার মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগও হয়নি। তাই পড়াশোনার জন্য মামার কাছে পাঠানো। সেখানেই ইংরেজি সাহিত্য, ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতি আর জীবনকে অন্য চোখে দেখার পাঠ। সেই পাঠই তাঁকে ঠেলে দেয় গতানুগতিক পথ ছেড়ে আলাদা কিছু করার দিকে। কুলটি গার্লস কলেজে ইংরেজি অনার্স, তারপর দিল্লিতে সাংবাদিকতা পড়া। কিন্তু কর্পোরেট চাকরির মোটা বেতন ছেড়ে দিলেন কেবল সিনেমা বানানোর নেশায়। পরিবারকে জানিয়েই বলেছিলেন, ‘‘আমি সিনেমাই করব।’’

২০২১ সালে পুরুলিয়ার পুঞ্চার ন’পাড়ায় শুরু প্রথম ছবির শুটিং। সেই ছবি Run to the River মুক্তি পায় ২০২৩ সালে। এরপরেই তাঁর দ্বিতীয় কাজ Songs of Forgotten Trees। এই ছবির কাহিনি দুই অসমবয়সী নারীর গল্প। এক জন অভিনেত্রী ও যৌনকর্মী, অন্যজন কলসেন্টারের কর্মী। মুম্বইয়ের এক ফ্ল্যাটে সহবাস, সম্পর্কের টানাপড়েন, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই— সব মিলিয়ে এক অন্য রকম কাহিনি। এই ছবিই অনুপর্ণাকে পৌঁছে দিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে।

পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি সামাজ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘আমার মামা মাই ফার্স্ট টিচার।’’ যে মামা একদিন তাঁর জীবন দেখার দিশা বদলেছিলেন, আজ সেই ভাগ্নির গৌরবের সাক্ষী হয়ে কেঁদেছেন তিনিও।

এবার অক্টোবরে ছবিটি যাবে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। তারপরই তিনি ফিরবেন নিজের জন্মভূমিতে, নিতুড়িয়ার ভিটেয়। সেখানেই শৈশবের দিনগুলোকে ফের একবার ছুঁয়ে দেখতে চান পুরুলিয়ার সেই মেয়ে, যিনি আজ বিশ্ব মঞ্চে বাংলার নাম উজ্জ্বল করেছেন।

হয়তো সত্যজিৎ রায় নন, কিন্তু পুরুলিয়ার সেই মাম্পিই আজ এমন এক অনুপর্ণা— যার সাফল্যের গল্প নিশ্চিতভাবেই সিনেমার মত।

Post Comment