সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া :
মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা। তার মধ্যেই বাঘমুন্ডির সুইসা ট্রিপল মার্ডারের রহস্য উদ্ঘাটন করল রাজ্য পুলিশ। পরকীয়া এবং সেই সম্পর্কের জেরে প্রেমিককে ব্ল্যাকমেল। প্রেমিকের কাছে পাঁচ লক্ষ টাকা দাবি করাতেই মৃত্যু হল কাজল মাছুয়ার (২৫)-এর। তারপর তাঁর বোন রাধা (১৩) এবং মেয়ে রাখি(৭)কেও খুন করা হয়।
পুরুলিয়া জেলা পুলিশের সহায়তায় মঙ্গলবার রাতে বাঘমুন্ডি থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার হয় দুই আততায়ী। ধৃতরা হল কাজলের প্রেমিক বাবুজান মোমিন এবং রাধার প্রেমিক বিজয় মাছুয়ার। তারা ঘটনার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। জিআরপি সূত্রে খবর, খুনের আগে ধৃত দুই প্রেমিকই তাদের প্রেমিকার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। মৃতদেহ উদ্ধারের স্থান লাগোয়া জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ের মধ্যে দেখা হয়েছিল চারজনের। সেখানেই প্রথমে ঘনিষ্ঠ হয় দুই যুগল। সেই সময় কাজলের সাত বছরের মেয়েকে কিছুটা দূরে বসিয়ে দেওয়া হয়। হাতে তুলে দেওয়া হয় কোলড্রিংকস ও চিপস, যাতে সে খাওয়ায় ব্যস্ত থাকে এবং বড়দের কথাবার্তা বা আচরণে নজর না দেয়।

কাজলের ঘরে দীর্ঘদিন ধরেই অভাবের ছায়া। দারিদ্র্যের চাপে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন স্বামী অজয় মাছুয়ার। সংসারের হাল ফেরানোর তাগিদে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে গোয়ায় কাজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কয়েকদিন আগে, গত বুধবারই তিনি রওনা দেন সেই কাজে যোগ দিতে। নিহত কাজলের স্বামী অজয় মাছুয়ার অভাবের তাড়নায় কয়েকদিন আগে গোয়ায় কাজ নিতে যান। তাঁর দাবি, বাবুজানই তাঁকে গোয়ায় যেতে সাহায্য করেছিল।
জিআরপি সূত্রে খবর, রবিবার বিকেলে সুইসা এলাকার একটি জঙ্গলে দেখা হয় চারজনের। প্রায় কুড়ি দিন পরে প্রেমিক বাবুজানের সঙ্গে দেখা হওয়ার জন্য অধীর ছিল কাজল। দেখা হওয়ার পরে বাবুজান ও কাজলের মধ্যে টাকা নিয়ে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। কাজল জানায়, পাঁচ লক্ষ টাকা না দিলে সে বাবুজানের ঝাড়খণ্ডের বাড়িতে উঠে যাবে। বিবাহিত বাবুজানের সংসারে স্ত্রী ও ছ’টি সন্তান রয়েছে। এমনকি বছর এক কন্যার বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, প্রায় মেয়ের বয়সী প্রেমিকা কাজল সেখানে গেলে সামাজিক সম্মান ধূলিসাৎ হবে। পুলিশ জানতে পেরেছে বাকবিতণ্ডা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একসময় কাজল তার প্রেমিককে লাথিও মারে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রথমে বাবুজান নিজেকে শান্ত করে। পরে ভালোবাসার অজুহাতে কাজলকে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে টেনে নিয়ে যায় এবং শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের পর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে খুন করে। কিছুটা দূরে বিজয় তখন রাধার সঙ্গে জীবনে প্রথমবার মিলিত হচ্ছিল। দুবার সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছে তারা। কাজলের খুনের কথা জানানোর পরে বাবুজান বিজয়কে বলে রাধাকেও মেরে ফেলতে হবে। বিজয় বাধা দিতে পারেনি। বরং গলায় ওড়না পেঁচিয়ে প্রেমিকাকে খুনে সাহায্য করে। এরপর খুনিদের টার্গেট হয় ছোট্ট রাখি। সাত বছরের এই শিশু চোখের সামনে মা ও মাসিকে খুন হতে দেখে ফেলেছিল। আততায়ীরা তার ফ্রকের কাপড় গলায় পেঁচিয়ে খুন করে।
মৃতদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় বিশ মিটার দূরে সুইসা এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রমাণ লোপাটের জন্য চান্ডিল-মুরি রেলপথের সুইসা ও তোড়াং স্টেশনের মাঝখানে প্রথমে রাধা ও কাজলের দেহ উপুড় করে শুইয়ে দেওয়া হয়। পরে রাখির দেহ সোজা অবস্থায় লাইনের উপর রাখা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত বাবুজানের বাড়ি ঝাড়খণ্ডের সরাইকেলা-খরসোওয়া জেলার চড়া গ্রামে হলেও তাঁর ইটভাটা রয়েছে বাঘমুন্ডির জিলিং গ্রামে। ওই ইটভাটার শ্রমিক ছিল নিহত কাজল এবং ধৃত বিজয়। ইটভাটায় কাজের সূত্রেই কাজল ও বাবুজানের পরকীয়া শুরু হয়। তাদের সম্পর্ক চলেছে প্রায় পাঁচ বছর। বিজয় মালিকের ঘনিষ্ঠ ছিলো বলে রাধার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। তবে সেই সম্পর্কে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা না হওয়ায় রাধার উপর রাগ ছিলই বিজয়ের।
মঙ্গলবার রাতে ধৃতদের গ্রেফতারের পর খড়গপুর রেল পুলিশ সুপার দেবশ্রী সান্যাল জানান, দুই অভিযুক্ত অপরাধ স্বীকার করেছে। বুধবার তাদের পুরুলিয়া আদালতে তোলা হচ্ছে।
বুধবার সাংবাদিক সম্মেলন থেকে খড়গপুর রেলওয়ে পুলিশ সুপার দেবশ্রী সান্যাল জানান, এই ঘটনায় দু’জন অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছে। তারা মৃতা কাজল মাছুয়ার (২৫) এবং তার বোন রাধা (১৩) র প্রেমিকদ্বয়। পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আমরা ধৃতদের পুলিশ রিমান্ডে নিচ্ছি। আরও কেউ হত্যাকাণ্ডে যুক্ত কি না তা জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।











Post Comment