
বিকাশ মাহাত
সহ শিক্ষক, চেক্যা হাই স্কুল, পুরুলিয়া।
ই-মেইল:b.k.mahatoprl@gmail.com
যোগাযোগ: ৯৭৩৫১২৪২৭৪
বাংলার,বাঙালীর তথা বাংলা ভাষাভাষীদের প্রাণের মহোৎসব হল শারদীয়া। অবশ্য শুধু বাঙালীই নয়, অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যেও এখন শারদীয়াকে নিয়ে উন্মাদনার শেষ নেই। আর সেই শারদীয়া উৎসব তথা দুর্গাপূজার ঢাকে আনুষ্ঠানিক কাঠি পড়তে শুরু করে এই মহালয়ার দিন থেকেই।
মহালয়া- আশ্বিনের শারদপ্রাতে বীরেন্দ্র কিশোর ভদ্রের গুরুগম্ভীর অথচ প্রাণের পরশ মাখানো কন্ঠে রেডিও বার্তা থেকেই যেন মহালয়ার সুর অনুরণিত হয়।
মহালয়া শব্দের অর্থ কী? ‘ মহা ‘ ও ‘আলয়’ শব্দের যোগে নবগঠিত এক শব্দ হল ‘মহালয়া’।
মহা মানে হল মহান (বিশাল), আলয় শব্দের অর্থ হল আবাস বা আশ্রয়। অনেকেই বলে থাকেন যে, যেহেতু মহালয়া থেকেই দেবীপক্ষের সূচনা হয়, তাই মহালয়া হল, দেবীর আশ্রয়, দুর্গা মায়ের আশ্রয়।
উলটো মতের বিশ্বাসী লোকের কথাও নেহাত কম নয়। স্বাভাবিক ভাবেই মহালয়া নিয়ে তাদের ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণও পিছিয়ে নেই। এই মতবিশ্বাসীরা মনে করেন, মহালয়াতেই পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে। তাই এই মহান আলয় হল পিতৃলোক।
তর্পণ কী ও কেন- তর্পণ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত তৃপ শব্দ থেকে যার অর্থ হল সন্তুষ্ট করা। তাই তর্পণ করার অর্থ হল, যাতে অন্যের তৃপ্তি হয়, তার জন্য জলদান করা। হিন্দু ধর্মে দেবতা, ঋষি ও পূর্ব পুরুষদের আত্মার উদ্দেশে জল নিবেদন করে তাদের সন্তুষ্ট করার রীতিকে বলা হয় তর্পণ।
এতে পূর্ব পুরুষের সাথে নিজের যোগসূত্রও আরো নিবিড় ভাবে অনুভূত হয়। কারণ, আমাদের শরীর তৈরি হয়েছে বাবা-মায়ের থেকে পাওয়া জীবকোষ দিয়ে, তারাও তাদের পিতামাতার শরীরের জীবকোষ থেকে সৃষ্টি হয়েছিলেন। আর আমরা যখন তর্পণে তাঁদের কথা স্মরণ করি, তাদের উদ্দেশে জল,অন্ন নিবেদন করি তখন আমি যে ছিন্নমূল কেউ নয়, আমার অস্তিত্ব চিরন্তন— এই ভাবনাটাও আমাদের শিহরিত করে, ইহজগৎ ছেড়ে চলে যাওয়া আমাদের পূর্ব পুরুষের সাথে একাত্মতা অনুভব করি।
৩) মহালয়ায় সাথে কীসের যোগ? শুভের নাকি অশুভের?— মহালয়ায় পালিত রীতি আসলে কীসের ইঙ্গিতবাহী? অনেকেই বলে থাকেন মহালয়া শুভ তো নয়ই, বরং অশুভের পরিচায়ক। আসলে পূর্বপুরুষদের স্মরণে অনুষ্ঠান কখনোই আনন্দের হতে পারেন। যেমন শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। প্রয়াত নিকটজনের উদ্দেশে পালনীয় আচার আচরণ প্রকৃত পক্ষেই শোকের অনুষ্ঠান। অনুরূপ ভাবে পূর্ব পুরুষদের স্মৃতির উদ্দেশে পালনীয় এই অনুষ্ঠান তাই শোকের আবহেই পালিত হয়, তাই এই দিনকে শুভ বলে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।
পক্ষান্তরে, আলাদা মতের বিশ্বাসীরা মনে করেন, হিন্দু শাস্ত্রানুযায়ী যে কোন শুভ অনুষ্ঠানের আগে পূর্ব পুরুষকে স্মরণ করার নিয়ম আছে। তাহলে তো সব অনুষ্ঠানই অশুভ হয়ে যায়। তাছাড়া তর্পণ হল জগৎব্যাপী মহামিলন ক্ষেত্রের এক অনুষ্ঠান।
তাছাড়া এই মহালয়াতেই শুরু হয় দেবীপক্ষের, আর তাতেই বাঙালির সবচেয়ে প্রাণের অনুষ্ঠান দুর্গাপূজা। শরৎকালের পালিত হয় তাই তার আরেক নাম হল শারদীয়া।
যাই হোক, মত এর পক্ষে বিপক্ষে নানান আলোচনা চলতেই থাকে। কিন্তু যে উৎসবকে ঘিরে জাকজমক,চাকচিক্য,বিনোদনের শেষ নেই, সেই উৎসবে সবাই মহানন্দের স্রোতে মিলিত না হয়ে কাঁহাতক আর থাকা যায়।
দুর্গাপূজা ও কার্ণিভাল- বাংলার দুর্গাপূজাকে ঘিরে এখন সারা রাজ্যজুড়েই শারদীয়ার কার্ণিভাল হতে শরু করেছে। কোলকাতার কার্ণিভাল ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে সেরার শিরোপা পেয়েছে। রাজ্য জুড়েই শুরু হচ্ছে উৎসবের আবহ। সেই আবহ সঙ্গীতের সূচনায় তাই মহালয়ার ধ্বনি ধ্বনিত হয়েছে কাকভোরেই। চলুন মেতে উঠি শারদীয়ার আনন্দে।
( লেখকের মতামত নিজস্ব )
Post Comment