নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত তৈরি করল একদল প্রাক্তনী ও অনুরাগী। যেখানে আজকের দিনে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, সেখানে এক অধ্যাপকের জীবৎকালেই টানা দশ বছর ধরে জন্মদিন উদ্যাপন, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ এবং গুণীজন সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য সামাজিক ইতিহাস।
২৬ ফেব্রুয়ারি পুরুলিয়ার জেলা বিজ্ঞান কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়-এর বাংলা বিভাগের অধ্যাপক স্বপনকুমার মণ্ডল-এর ৫২তম জন্মদিন পালিত হয় মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনে। বিকেল আড়াইটায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের আটজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ‘জীবনের পরম পরশ সম্মাননা’ এবং দুজন কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
২০১৭ সালে অধ্যাপকের ছাত্রছাত্রী ও অনুরাগীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘জীবনের পরম পরশ কমিটি’। মূল উদ্দেশ্য ছিল, একজন শিক্ষকের অবদানকে তাঁর জীবদ্দশাতেই সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে মূল্যবোধের স্তরে প্রতিষ্ঠিত করা। দশ বছরে এই উদ্যোগ শুধু একটি জন্মদিন উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি পরিণত হয়েছে এক সামাজিক আন্দোলনের রূপে। প্রতি বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানের পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে তাকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ।
এ বছরের দশম বর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণে কমিটির প্রধান উদ্যোক্তা ও দশ বছরের কাণ্ডারী ড. কার্তিক কুমার মণ্ডল সংগঠনের যাত্রাপথ, প্রতিবন্ধকতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, “এই উদ্যোগের লক্ষ্য কেবল ব্যক্তিকে সম্মান জানানো নয়, বরং সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা”।
পুরুলিয়া ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য প্রাক্তনী, গবেষক, অনুরাগী এবং শিক্ষানুরাগীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের আবেগঘন বক্তব্যে উঠে আসে একজন শিক্ষকের প্রভাব কতটা গভীর ও সুদূরপ্রসারী হতে পারে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টদের মধ্যে ছিলেন পঙ্কজ পাল, দিলীপ মিস্ত্রি, ড. সুভাষ রায়, প্রবোধচন্দ্র পাল, দেবাশিস মণ্ডল, দেবাশিস সরখেল, ড. জলধর কর্মকার, দীপেন গুপ্ত, রামামৃত মহাপাত্র, অভ্রদীপ গোস্বামী, রামকৃষ্ণ বর্মণ, সমর কিশোর মাহাত, স্বপনকুমার সাউ, লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল, ড. সত্যজিৎ বসাক প্রমুখ। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ড. বিকাশ কালিন্দী।
অনুষ্ঠানের কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন সমসাময়িক সমাজে শিক্ষকের অবস্থান কোথায়? অধ্যাপক স্বপনকুমার মণ্ডল তার বক্তব্যে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মূল্যবোধের সংকট নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক মত প্রকাশ করেন। তার কথায়, “শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়।” এই প্রসঙ্গেই তিনি মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
দশ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে একজন শিক্ষকের জন্মদিন উদ্যাপন নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি এক প্রজন্মের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। যেখানে প্রায়শই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক পেশাগত সীমায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখানে এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিল, শ্রদ্ধা ও মানবিক বন্ধন এখনও সমাজে বেঁচে আছে।









Post Comment