দেবীলাল মাহাত, আড়শা:
শীতের আগমনের প্রাক্কালে আশ্বিন সংক্রান্তির দিন পুরুলিয়া সহ মানভূমে পালিত হল ‘ জিহুড়’ উৎসব। প্রাচীন কাল থেকে নতুন ধান ঘরে তোলার আগে জঙ্গলমহলের বিস্তৃত এলাকার কৃষিজীবি মানুষ দিনটি পালন করে থাকেন। সময়ের সাথেসাথে জীবনযাত্রায় বদল এলেও, প্রাচীন রীতি রেওয়াজ মেনে আজও বজায় জিহুড় উৎসবের নিজস্বতা।
কাশিপুর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ ক্ষীরোদ চন্দ্র মাহাত বলেন, “‘ জিও হোড়’ থেকে ‘জিহুড়’ শব্দটি এসেছে । যার অর্থ- বেঁচে থাকা। কৃষিজীবি মানুষের বিশ্বাস – জিহুড়ের দিন শেষ বৃষ্টিপাত হয় । এদিনের পর থেকে আর বৃষ্টিপাত হয় না।

১৩ ই জ্যৈষ্ঠ রোহিনে যে বিষাক্ত সর্পগুলো গর্ত থেকে বের হয়েছিল, জিহুড় দিনে সেই সর্পগুলো বৃষ্টির জল পান করে আবার গর্তে ঢুকে শীত ঘুমে চলে যায়। শীত এসে পড়ায়, তারা গর্ত থেকে আর বের হয় না। তাছাড়া রোহিনে যে মন্ত্রতন্ত্র শিক্ষা শুরু হয়েছিল। তাঁরও সমাপ্তি ঘটে। গ্রাম্য দেবতার পুজার পাশাপাশি মনসা পুজারও এদিন শেষদিন।”
এদিন কৃষক পরিবারের মহিলারা ঘর,আঙ্গিনা গোবর জলের ছিটে দিয়ে পরিষ্কার করেন। প্রতিটি বাড়ির তুলসি মঞ্চ সহ গৃহের অভিমুখ দরজায় চালের গুঁড়ি দিয়ে আলপনায় আঁকেন মা লক্ষ্মীর পদচিহ্ন। কারণ এরপরেই গৃহে আসবেন মা লক্ষ্মী (ধান) । কৃষকের দুচোখে থাকে, সোনালী ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন। তাই নতুন ফসলকে আহ্বান করা হয়।

কৃষকরা কোদাল দিয়ে ঘাস,আগাছা চেঁছে খামার পরিষ্কার করে,জমি সমতল করেন। যাকে বলা হয় ‘খামার বাঁধা ‘। সন্ধ্যার পরে গৃহকর্তা একটি মাটির হাড়ি বা ভাঙ্গা কারাহি ,বড়ের (খড়)ঢুলা, পুরানো ঝাঁটা, ভাঙ্গা কুলা, ভেলা ডাল ,চিরচিটি রেখে খামার প্রতিষ্ঠা করেন। গৃহকর্ত্রী শালপাতার খোলা বানিয়ে তেল, সলতে দিয়ে প্রদীপ বানিয়ে জ্বালিয়ে রাখেন। তাদের বিশ্বাস , এর ফলে নতুন ফসল খামারে তোলার আগে অপদেবতার ভর বা কুনজর পড়বে না । ‘বাঁদনা ‘পরব উপলক্ষ্যে গরুর শিং এ তেল মাখানো শুরু হয়। কারণ কৃষিকাজে গবাদি পশুদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গৃহস্থের শ্রীবৃদ্ধির জন্য তারাও সারাবছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকেন।
সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক তথা কুড়মালি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডঃ সনৎ কুমার মাহাত বলেন, “পরিবারে নতুন সদস্য আসার আগে সকলে যেমন গর্ভবতী মায়েদের সেবাযত্ন করে থাকেন, তেমনি রোহিন পরবে যে ধানের চারা রোপণ করা হয়েছিল, সেই ধানগাছ পরিপুষ্ট হয়ে আজ গর্ভবতী, শুধু ফোটার অপেক্ষায় । তাই আজকে কৃষকরা নতুন ধান বাড়িতে তোলার আগে , জমিতে ধানদের ‘সাধভক্ষণ’ করানোর পাশাপাশি’ অপদেবতার নজর থেকে রক্ষা পেতে খামার বাঁধেন।”

আড়শা ব্লকের তুম্বাঝালদা গ্রামের বাসিন্দা চিত্তরঞ্জন মাহাত, পুরুলিয়া ১নং ব্লকের কাটাবেড়া গ্রামের বাসিন্দা হরিপদ মাহাত বলেন, “প্রতিটি কৃষক পরিবারে সোনালী ধান ঘরে তোলার আগে লক্ষ্মীকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি, প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা রীতি রেওয়াজ খামারে করা হয়েছে।










Post Comment