নিজস্ব প্রতিনিধি , পুরুলিয়া:
শুধু ঝরছে না, পুরুলিয়ায় বৃষ্টি যেন বইছে। এই খরাপ্রবণ জেলায় এবারের জুন-জুলাই মাসে এত বেশি বৃষ্টি হয়েছে যে, গত দশ বছরের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। চলতি বর্ষা মরসুমে জুন ও জুলাই মিলিয়ে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের থেকে ৯০.৩ শতাংশ বেশি— এমন ঘটনা আগে হয়নি বললেই চলে।
বৃষ্টিপাতে রুখা পুরুলিয়ার জলবায়ুর বদল স্পষ্ট। ঝাঁকে ঝাঁকে নিম্নচাপ এসে শুধু বর্ষাকে সক্রিয় করেনি, বরং কৃষি ও পরিবেশে আশার আলো জ্বালিয়েছে। কেউ বলছেন জঙ্গল বৃদ্ধির ফল, কেউ বলছেন আবহাওয়ার বিশ্বজুড়ে পরিবর্তন। কিন্তু ফল যা হওয়ার তাই— পুরুলিয়ার মাটিতেও এবার কৃষিতে বান।
৬টি নিম্নচাপ, ঘন জঙ্গল, আর লা-নিনা
পুরুলিয়া কৃষি দফতরের উপ-অধিকর্তা (প্রশাসন) আদিত্য দুয়ারির মতে, “গত ১০ বছরে এমন অতি বৃষ্টি হয়নি। কৃষি উৎপাদনের দিক থেকেও এটা বিরাট সুযোগ।” জুন-জুলাইতে এই জেলায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা ৫৫১.৪০ মিমি। বাস্তবে হয়েছে ১০৪৯.৫৫ মিমি— প্রায় দ্বিগুণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তত ৬টি নিম্নচাপ এই দুই মাসে সক্রিয় ছিল দক্ষিণবঙ্গে। একই সঙ্গে, পুরুলিয়ার জঙ্গল বৃদ্ধিও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। বন দফতরের হিসেব অনুযায়ী, জেলায় ৩.৭১ শতাংশ জঙ্গল বেড়েছে। যার ফলে তাপপ্রবাহ কমেছে, পাহাড় সবুজ হয়েছে, মাটি ও বায়ু শীতল হয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিবর্তনই মেঘের গঠন ও বৃষ্টিপাতে সহায়ক ভূমিকা নিচ্ছে।
“জল ধরো জল ভরো”-এর সুফল
জেলাজুড়ে খাল-বিল-ডোবায় জল সংরক্ষণ প্রকল্প ‘জল ধরো জল ভরো’ দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। সেই জল সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে গিয়ে বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে বলে মত জেলা বিজ্ঞান কেন্দ্রের আধিকারিক ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়ের। তাঁর কথায়, “এল নিনো থেকে লা নিনা দশার দিকে এগোচ্ছে আবহাওয়া। পুরুলিয়ায় বনভূমি বাড়ছে। সব মিলিয়ে আবহাওয়ার ভিতর একটা বড় পরিবর্তন চলছে।”
রেকর্ড আমন রোপণ
বৃষ্টি হলে চাষির মনও ভরে। পুরুলিয়া কৃষি দফতরের তথ্য বলছে, ৩১ জুলাই পর্যন্ত এই জেলায় ২ লক্ষ ৮৫ হাজার ৬৮৮ হেক্টর জমিতে আমন রোপণ হয়ে গিয়েছে। টার্গেট ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ ৮২ শতাংশেরও বেশি কাজ হয়ে গিয়েছে জুলাইতেই। তুলনায় গত বছর এই সময়ে আমন রোপণ হয়েছিল মাত্র ২০ হাজার ৫০০ হেক্টরে। কারণ, ২০২৩-এ বর্ষা মরসুমে জেলায় ৫৬.৩ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল।
গত বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লক্ষ ৪৮ হাজার হেক্টর। ফলন হয়েছিল মাত্র ৩ লক্ষ ২৮ হাজার হেক্টরে। তার আগের বছরও (২০২২) জুন-জুলাইতে ঘাটতি ছিল ৪২.৭ শতাংশ। অথচ এবারে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। কৃষি দফতরের ধারণা, এবার টার্গেট পূরণ তো হবেই, সেই সঙ্গে অতিরিক্ত উৎপাদনের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।
পুরুলিয়া এখন ‘সবুজ’ জেলা
এক সময়ের ‘ড্রাই জোন’ বলে চিহ্নিত পুরুলিয়া এখন সবুজের পথে। গরমে ৪৫-৪৬ ডিগ্রি পার করার বদলে এবারে তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করেছে ৪২-৪৩ ডিগ্রির মধ্যে। বন দফতরের মতে, এটি গাছপালা বাড়ার ফল। পাহাড়ে গাছ বাড়লে, পাহাড় ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা পাহাড়েই জমে জলীয় বাষ্প, জন্ম নেয় বৃষ্টি।
পুরুলিয়া ডিভিশনের ডিএফও অঞ্জন গুহ বলেন, “জেলায় জঙ্গল বাড়লে শুধু পশু-পাখি রক্ষা পায় না, বরং তার পরিবেশগত প্রভাব বহু গভীর। আমরা তা এবার হাতেনাতে বুঝতে পারছি।”
সমাপ্তি নয়, শুরু
এই দুই মাসের বর্ষা নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। কীভাবে প্রকৃতিকে ফেরানো যায়, তার প্রমাণ হয়ে উঠছে পুরুলিয়া। খরা নয়, এখন বর্ষা নিয়ে গর্ব করতে শিখছে জেলা।











Post Comment