দেবীলাল মাহাত, আড়শা :
‘বাঁদনা’ পরবের প্রস্তুতিতে মাতোয়ারা পুরুলিয়া সহ ছোটনাগপুর অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ। এই প্রস্তুতি চলে কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথির আগের দিন পর্যন্ত। তারপর কালিপূজার দিন অর্থাৎ অমাবস্যার রাত থেকে হয় ‘বাঁদনা’ পরবের সূচনা। পরব চলে তিন দিন ধরে । শেষ হয় ‘বুড়ি বাঁধনার’ দিন। আবার কোথাও কোথাও পরব চলে পাঁচ বা সাত দিন। মূলত গো বন্দনা হিসাবেই এই পরব বেশি পরিচিত। কুড়মালি শব্দ ‘বঁদা ‘থেকে’ বাঁদনা ‘শব্দটির উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ মনে করেন ‘বন্দনা’, ‘বাঁধন’ বা ‘বন্ধন’ শব্দ থেকেও হতে পারে।
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম সহ ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষের অন্যতম প্রাণের উৎসব ‘বাঁদনা’। এটি কুড়মি সহ কয়েকটি আদিবাসী সমাজের কৃষিভিত্তিক উৎসব। আমন ধান বাড়িতে তোলার আগে গো-গাভীদের বন্দনা করার রীতি। বলা যায়, গো পূজাকে ঘিরেই বাঁদনা পরবের অনুষ্ঠান । অমাবস্যার রাত থেকে এই পরবের সূচনা হলেও প্রস্তুতি শুরু হয় দিন পনেরো আগে থেকেই । সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক তথা কুড়মালি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডঃ সনৎ কুমার মাহাত বলেন, “করম পরবের শেষ দিন করম ডালি বিসর্জনের মধ্য দিয়েই এই পরবের সূচনা হয়ে থাকে । ‘অহিরাগীত’ গেয়ে বিসর্জন দেওয়া হয় করম ডালির।” তারপর থেকেই ধাপে ধাপে শুরু হয় বাঁদনা পরবের প্রস্তুতি।

এই সময় থেকেই থাকে কৃষিজীবী মানুষের চরম ব্যস্ততা। গোয়াল ঘর সহ সমস্ত ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে , মাটির প্রলেপ, রং দিয়ে সাজিয়ে তোলেন মহিলারা। সাজিয়ে তোলা হয় পুরো গ্রামকে। অমাবস্যার আগের দু’ দিন গো-গাভীদের পেট ভরে ঘাস খাওয়ানো হয়। স্নান করিয়ে শিং,খুর ও মাথায় তেল, সিঁদুর দেন কৃষিজীবী মানুষ। বাঁদনার পাঁচ দিন – তেল দেওয়া, ঘাওয়া, অমাবস্যা, গরয়াপূজা , গরু খুঁটা নামে পরিচিত।

অমাবস্যার দিন হয় ‘গোঠপূজা’। করা হয় ‘ছাদনদড়ি’ ও ‘বাঁধনদড়ির’ পুজাও। বিকালে গ্রামের এক প্রান্তে গরু গুলো একত্র করা হয়। সেখানে আলপনা এঁকে, তার মধ্যে রাখা হয় ডিম। এর পর ঢোল, ধামসা বাজিয়ে গোরুগুলিকে উত্তেজিত করা হয় । যে গরু ডিমটা ভাঙ্গবে সেই গরুর মালিককে গামছা, লুঙ্গি ,ধুতি দিতে হয় গ্রামের লায়াকে। সন্ধ্যার দিকে বাড়ির দরজা,তুলসিতলা সহ বিভিন্ন জায়গায় শাল, কাঁঠাল গাছের পাতায় চালের গুড়ি রেখে ,সলতে দিয়ে জ্বালানো হয় প্রদীপ। এই রীতিকে বলা হয় ‘কাঁচি দিয়ারি’। গ্রামের শেষ স্থানে পাট কাঠি জ্বালিয়ে উপস্থিত হয় গ্রামের ছেলেরাও। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, এই জ্বলন্ত আগুন ডিঙোলে সারাবছর খোস,দাদ এমন সব চর্ম রোগ থেকে মুক্তি মেলে। যার নাম- ‘ইজোর-পিজোর’ খেলা। রাতে গ্রামের মানুষ ঢোল,ধামসা সহ লোকবাদ্য নিয়ে সবার বাড়িতে যান। অহিরা গীত গেয়ে গো-গাভীদের জাগিয়ে রাখেন। যারা অহিরা গীত গেয়ে গো-গাভীদের জাগিয়ে রাখেন তাদেরকে বলা হয়’ ধিং ধাং বা ধাঁঙড়’। অহিরা গীতগুলো লোকসংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। ছোট নাগপুর মালভূমি অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস , অমাবস্যার রাতে মর্ত্যলোকের প্রতিটি গোয়াল বাড়িতে আসেন বুড়াবাবা” ( স্বয়ং শিব)। এসে দেখেন গো গাভীরা কেমন আছেন। সেই জন্য সারারাত গোয়াল ঘরে জ্বালানো হয় ঘিয়ের প্রদীপ।

অমাবস্যার পরের দিন প্রতিপদে ‘গরয়া পূজা’। ভোরবেলা হয় ‘দাঁদুড় খেদা’ নাচ। সংসারে ব্যবহৃত পুরানো ঝুড়ি, কুলো, টোকিয়া গ্রামের শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেন মহিলারা । তারপর আগুন জ্বালিয়ে দেন । তারা বিশ্বাস করেন, এতে গ্রামের অমঙ্গল দূর হয়। কৃষকরা লাঙ্গল,জোয়াল,মই চাষের যন্ত্রাংশ পরিষ্কার করে তুলসী তলায় রাখেন। জমি থেকে আনা ধানের শিষ দিয়ে গয়না তৈরী করে গরুর শিং এ পরিয়ে দেন। মহিলারা বাড়ির উঠোনে আলপনা আঁকেন। দুপুর বেলা গোয়াল ঘরে শালুক পাতার উপর মাটির শিবলিঙ্গ রেখে পুজা করেন কৃষকরা। পূজার নৈবেদ্য হিসাবে বানানো হয় ‘গরয়া পিঠা’। অনেকে মোরগ বলি দেন।

পঞ্চমদিন অর্থাৎ শেষদিন ‘গরু খুঁটা ‘। দুদিন ধরে গরুকে সেবাযত্ন করে উৎসবের শেষ দিনে বিকাল বেলায় গ্রামের ফাঁকা মাঠে ও কুলিতে সবল গরুগুলোকে বিভিন্ন রং এ সাজিয়ে একটি শক্ত খুঁটিতে বাধা হয়। তারপর সামনে মরা পশুর চামড়া ঘুরিয়ে তাকে উত্তেজিত করে তোলেন গ্রামবাসীরা। সেই সঙ্গে চলে ঢোল,ধামসা সহযোগে চলে অহিরা গীত পরিবেশন।
কাশিপুর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ ক্ষীরোদ চন্দ্র মাহাত বলেন, “অতি প্রাচীন কাল থেকে নিজস্ব রীতি মেনে এই পরব পালন করে আসছে কুড়মি সহ আদিবাসী সমাজের মানুষ। সেই রীতি রেওয়াজ এখনও চলছে।”
আসলে গবাদি পশুদের কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য এই উৎসব নিবেদিত করে থাকে কৃষিজীবী মানুষ। কারণ কৃষিভিত্তিক সভ্যতায় গবাদি পশুদের অবদান অপরিহার্য। গৃহস্থের শ্রীবৃদ্ধির জন্য তারাও সারাবছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকে। সেই জন্য বাঁদনা পরবে আমন ধান বাড়িতে তোলার আগে কৃষি সহায়ক যন্ত্রপাতি সহ গো-গাভীদের বন্দনা করে থাকেন কৃষিজীবী মানুষ। তাদের দিয়ে কোনো কাজ করানো হয় না। দেওয়া হয় বিশ্রাম। বিশ্বায়নের যুগে নাগরিক সংস্কৃতি গ্রামীণ সংস্কৃতির ওপর থাবা বসালেও আজও কৃষিজীবী মানুষ ধরে রেখেছেন তাঁদের ঐতিহ্য, তাঁদের সংস্কৃতি।










Post Comment