insta logo
Loading ...
×

“এভাবে কি মানুষকে ম”রতে হয়?” বরাভূম স্টেশনের অমানবিক ছবি

“এভাবে কি মানুষকে ম”রতে হয়?” বরাভূম স্টেশনের অমানবিক ছবি

নিজস্ব প্রতিনিধি , বলরামপুর :

যে পথে ছুটছে বন্দে ভারত, সেই রেল পথ দিয়েই স্ত্রীর নিথর শরীর কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন পঞ্চাশোর্ধ মনোজ কর্মকার। পায়ে হেঁটে। স্থানীয় এক যুবক যদি না জিজ্ঞেস করতেন কাঁধে ওটা কী? তাহলে রেল লাইন বরাবর স্ত্রীর দেহ কাঁধে নিয়েই বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতেন পুরুলিয়া শহরের গোশালা মোড়ের ওই বাসিন্দা।

সেই ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে ওড়িশার কালাহান্ডির এক ছবি গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দানা মাঝি নামের এক গরিব মানুষ স্ত্রীর মৃতদেহ কাঁধে চাপিয়ে ৬৭ কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরেছিলেন, কারণ হাসপাতাল তাঁকে শববাহী গাড়ি দেয়নি। সেই ঘটনার পর কেটে গিয়েছে প্রায় এক দশক। কিন্তু সেই আগস্ট মাসেই সোমবারের সকালে পুরুলিয়ার বরাভূম স্টেশনে চোখে পড়ল একই রকম নির্মম ছবি।

প্ল্যাটফর্মের এক কোণে স্ত্রীর নিথর দেহ নিয়ে বসে রয়েছেন মনোজ কর্মকার। পাশে ছুটে চলেছে ট্রেন, যাত্রীদের ভিড়। কিন্তু কেউ দাঁড়ায়নি। অভিযোগ, টানা ছ’ঘণ্টা ধরে প্ল্যাটফর্মেই পড়ে রইল তাঁর স্ত্রী শান্ত্যা কর্মকারের দেহ। সাহায্যের জন্য বারবার অনুরোধ করেও রেল পুলিশের থেকে কোনও সাড়া মেলেনি। উল্টে পুলিশ তাঁকেই দেহ সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেয়।

সাহায্যের জন্য বারবার অনুরোধ করেও কোনও সাড়া মেলেনি জিআরপি-র কাছ থেকে। উল্টে নাকি মনোজ বাবুকেই বলা হয়েছে দেহ সরাতে। রেলের এমন অমানবিক আচরণ নাড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

স্থানীয়দের বক্তব্য, এই ঘটনায় স্পষ্ট দায় এড়াতে চেয়েছিল জিআরপি। স্থানীয় বাসিন্দারা অবশেষে বলরামপুর থানার দ্বারস্থ হন। আসে পুলিশ। বিকেলের দিকে চাপের মুখে পড়ে জিআরপি দেহ উদ্ধার করে পুরুলিয়া জেলা হাসপাতালে পাঠায় ময়নাতদন্তের জন্য। জিআরপি সূত্রে জানা গিয়েছে, শান্তা ও মনোজ দু’জনেই পুরনো বোতল কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মঙ্গলবার ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

স্বামী মনোজ কর্মকারের সঙ্গে বছর চল্লিশের শান্তা ঝাড়খণ্ডের কান্ডরা স্টেশন থেকে গোমো এক্সপ্রেসে চড়ে ফিরছিলেন। ট্রেন চলার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন শান্ত্যা। সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তেই বরাভূম স্টেশনে ট্রেন থামলে তাঁকে কোলে করে নামিয়ে আনেন স্বামী। এরপর দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে প্ল্যাটফর্মেই পড়ে ছিল মৃতদেহটি। না পড়েছিল বললে অর্ধসত্য বলা হবে, একটা গতি করতে স্টেশনের এ প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কাঁধে চাদর মোড়া স্ত্রীর নিথর দেহ।

চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর প্রশ্ন, “দানা মাঝির ঘটনায় দেশ কেঁপে উঠেছিল। এত বছর পরে কি আমরা কিছুই শিখলাম না? একটা দেহ ছ’ঘণ্টা ধরে প্ল্যাটফর্মে পড়ে রইল, অথচ নির্বিকার রইল জিআরপি—এটা কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়?”

স্টেশন সংলগ্ন দোকানদারদের কথায়, “সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মৃতদেহ পড়ে রইল, অথচ নজরে এল না রেল পুলিশের? নাকি ইচ্ছে করেই দায়িত্ব এড়াল তারা?”

বরাভূম স্টেশন ম্যানেজার বিধান চন্দ্র মন্ডল ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। খড়গপুর রেল পুলিশ সুপার দেবশ্রী সান্যাল ফোন তোলেননি।

Post Comment