সুজয় দত্ত , পুরুলিয়া :
ফাগুন এসেছে, দোল-হোলিও দরজায়। অথচ পুরুলিয়ার আকাশে এখনও পুরোপুরি ডানা মেলেনি আগুনরঙা পলাশ। যে সময় পাহাড়-জঙ্গল জুড়ে লাল ফুলের আগুনে রঙিন হয়ে ওঠার কথা, সেখানে এ বছর সবে দেখা মিলছে কুঁড়ি।
কেন ফুটলো না পলাশ? দীর্ঘ শীতের স্পর্শ আর উৎসবের ক্যালেন্ডার এগিয়ে আসায় কিছুটা তাল কেটেছে প্রকৃতির ছন্দ। সরস্বতী পুজো যেমন এ বছর অনেকটাই আগে চলে এসেছিল, তেমনই এগিয়ে এসেছে দোল। ফলে পলাশের পূর্ণ বিকাশের সময় মেলেনি। পলাশ সেভাবে নেই তবু পর্যটকের ঢল থামেনি। দোলের আগে কার্যত হাউসফুল পুরুলিয়া। হোটেল, লজ, কটেজ বা রিসর্ট কর্তৃপক্ষের একটাই বক্তব্য ছিল—শীত কাটিয়ে একটু উষ্ণতা না এলে ফুটবে না পলাশ।
গত কয়েক দিনে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ায় বিক্ষিপ্তভাবে ফুল ফুটতে শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু যে লাল সমুদ্র দেখতে অভ্যস্ত পর্যটকেরা, তার দেখা মিলছে না। ফলে কোথাও কোথাও হতাশার সুর। তবে সেই আক্ষেপ কিছুটা মিটছে কুসুম গাছের লাল কচি পাতায়, যা এই বসন্তে আলাদা রঙ এনে দিয়েছে অযোধ্যা পাহাড়ের প্রকৃতিতে।
পলাশ না থাকলেও উৎসবের আমেজে ভাটা নেই। এখন দোলকে কেন্দ্র করে পুরুলিয়াতেও আয়োজন হচ্ছে বসন্ত উৎসবের, অনেকটা বোলপুর-শান্তিনিকেতনের আদলে। রিসর্ট ও কটেজগুলিতে চলছে বিশেষ আয়োজন, রঙিন খাবারদাবারের থিম। অযোধ্যা হিলটপে রাজ্য পর্যটন বিভাগের লিজপ্রাপ্ত রিসর্ট ‘কুশল পল্লী’-তে এ বছরের দোল উৎসবের থিম—‘রঙ্গিলা পলাশ পার্বণ’। সোম থেকে বুধ তিন দিন ধরে চলবে এই বিশেষ আয়োজন।

রিসর্টের জেনারেল ম্যানেজার সুদীপ্ত কুমার বলেন, “শীত অনেক দিন থাকায় পলাশ পুরোপুরি ফোটেনি। তবে একেবারেই দেখা মিলবে না, এমন নয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তার ওপর এই বসন্তে পুরুলিয়ার আবহাওয়াই আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। তাই দোলের আগেই সব বুকিং পূর্ণ।”
রিসর্টে লাঞ্চের নাম রাখা হয়েছে ‘দ্য পলাশ স্প্রিং সিম্ফনি ব্রাঞ্চ’ এবং ডিনার ‘পলাশ আন্ডার দ্য স্টারস’। রঙের আবহ বজায় রাখতে খাবারের নামেও রয়েছে উৎসবের ছোঁয়া। তিন দিনের জন্য বিশেষ মেনুতে দেশি-বিদেশি নানা পদ, চাট স্টেশন, লাইভ কাউন্টার থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন—সব মিলিয়ে রসনা তৃপ্তির আয়োজন। জনপ্রতি মূল্য ৯৯৯ টাকা।
হাওড়া থেকে বেড়াতে আসা বনানী বিশ্বাস ও স্মরণিকা বিশ্বাসের কথায়, “চারদিকে আগুনরঙা পলাশ না দেখে একটু খারাপ লাগছে ঠিকই। কিন্তু পুরুলিয়ার সৌন্দর্য মন ভরিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়, পাকদণ্ডি পথ, জলাধার—সব মিলিয়ে অন্যরকম অভিজ্ঞতা। দার্জিলিং বা সিকিমের বাইরে এমন পাহাড়ি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ এখানেও আছে, না এলে বুঝতাম না।”
দোল-পলাশ পর্যটনকে ঘিরে জমজমাট ব্যবসা ছৌ মুখোশের গ্রাম চড়িদাতেও। স্থানীয় শিল্পীদের দোকানে ভিড় বাড়ছে পর্যটকদের। অন্যদিকে, পলাশ গাছের নিচে ছবি তুলতে আগেভাগেই গাইড বুক করছেন অনেকেই। কারণ রিসর্ট থেকে বেরোলেই যে চোখে পড়বে লাল পলাশ—এ বার আর তা নয়। অযোধ্যা পাহাড়, গড় পঞ্চকোট, বড়ন্তি বা দুয়ারসিনির কোন এলাকায় ফুল ফুটেছে, তা জানতে ভরসা রাখতে হচ্ছে স্থানীয় গাইডদের উপরেই। ফলে তাঁদের চাহিদা ও পারিশ্রমিক,দু’টিই বেড়েছে।
পলাশ কম, কিন্তু ফাগুনের রং ফিকে নয়, এই সমীকরণেই এ বছরের দোলের আগে নতুন রূপে ধরা দিয়েছে পুরুলিয়া। আগুনরঙা ফুলের অভাব থাকলেও উৎসব, প্রকৃতি আর মানুষের উচ্ছ্বাস মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে বসন্তের অন্য এক গল্প।









Post Comment