নিজস্ব প্রতিনিধি,পুরুলিয়া:
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য সরকারের ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসূচি ছিল এক প্রকার নির্বাচনী ‘মেগা হিট’। এবার ২০২৬ নির্বাচনের প্রাক্কালে তৃণমূল কংগ্রেস ফের সেই সাফল্যের ছায়াপথ ধরতে চলেছে ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’ প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই যার মূল উদ্দেশ্য। ভোটের বৈতরণী পার করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রকল্প হতে চলেছে নতুন অস্ত্র— এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পুরুলিয়া জেলায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গঠিত হয়েছে ২৩ সদস্যের একটি জেলা টাস্ক ফোর্স। জেলাশাসক রজত নন্দার নেতৃত্বে প্রশাসনিক কনফারেন্স হলে শুক্রবার এই প্রকল্পের রূপরেখা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়।
জেলাশাসক জানান, “প্রথম দিনেই জেলায় ২৩টি শিবির করা হয়েছে। রাজ্যের নির্দেশ অনুযায়ী বুথভিত্তিক এই ক্যাম্পগুলোয় বাসিন্দাদের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকল্প নির্ধারণ করা হবে। কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে বরাদ্দকৃত অর্থের সীমা ছাড়িয়ে গেলে অতিরিক্ত ব্যয় সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকেই পূরণ করতে হবে।”

✨বিস্তৃত রূপরেখা ও টাস্ক ফোর্সের কাজের পরিধি
পুরুলিয়ায় বর্তমানে বুথের সংখ্যা ২৫২৮। তিনটি বুথ মিলিয়ে একটি করে শিবির বা ক্যাম্প করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী, জেলার মোট ক্যাম্প সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৮৫০। প্রতিটি প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা এবং প্রতিটি বুথে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ থাকবে। প্রয়োজন হলে বরাদ্দের অতিরিক্ত অর্থ জেলা দপ্তর থেকেই আসবে।
টাস্ক ফোর্সের মধ্যে রয়েছেন পুলিশ সুপার, তিন জন অতিরিক্ত জেলাশাসক, চারটি মহকুমার মহকুমাশাসক, জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক, গ্রামোন্নয়ন, শিক্ষা, পরিবহণ, শিশু বিকাশ, পূর্ত, বিদ্যুৎ, কৃষি বিপণন, তথ্য-সংস্কৃতি সহ মোট ১৬টি দপ্তরের আধিকারিকরা।
এই প্রকল্পে প্রত্যেক বুথের মানুষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্ধারণ করা হবে। প্রস্তাব ব্লক ও মহকুমা স্তর ঘুরে জেলা স্তরে আসবে। এরপর জেলা টাস্ক ফোর্সের অনুমোদন সাপেক্ষে তা যাবে রাজ্য স্তরে। চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে।
✨নির্ধারিত সময়সীমা: এক ঝলকে দেখে নিন
২ আগস্ট – ৩ নভেম্বর: বুথভিত্তিক বৈঠক ও প্রকল্প চূড়ান্তকরণ
১৫ নভেম্বর: সব প্রকল্প রাজ্য পর্যায়ে পাঠানো শেষ
১৫ জানুয়ারি: প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শেষ করার নির্দেশ
সরকারি ছুটির দিন বাদ দিয়ে সবমিলিয়ে ৬১ কার্যদিবসের মধ্যে পুরো কাজ সেরে ফেলার নির্দেশ রয়েছে।
✨কী কী প্রকল্প থাকছে?
এই প্রকল্পে ১৬টি বিভাগের আওতায় এলাকাভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প গৃহীত হবে। সেই বিভাগগুলি হল:
.নিকাশী ও পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা
.পানীয় জলের পরিষেবা
.পথবাতি স্থাপন ও মেরামতি
.কমিউনিটি টয়লেট
.অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র উন্নয়ন
.প্রাথমিক স্কুল পরিকাঠামো উন্নয়ন
.জলাশয় সংস্কার ও সংরক্ষণ
.আবর্জনা ব্যবস্থাপনা
.জনসাধারণের ছাউনিযুক্ত বসার জায়গা
.বাজার এলাকা উন্নয়ন
.সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো ও মঞ্চ
.পরিবহন সংযোগ উন্নয়ন
.সবুজায়ন প্রকল্প
.বিদ্যুৎ পরিষেবা সম্প্রসারণ
.রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার
.বিবিধ স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প
✨প্রচারে জোর
মাইকিং ছাড়াও রাজ্যের লোকপ্রসার প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যাম্পের প্রচার চলছে পুরুলিয়ার গ্রামেগঞ্জে।
✨জনগণের অংশগ্রহণই মুখ্য
প্রতিটি শিবিরে সংশ্লিষ্ট বুথ এলাকার বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের সম্মিলিত পরামর্শে প্রকল্প নির্বাচন হবে। প্রস্তাব গৃহীত হলে তা ব্লক → মহকুমা → জেলা → রাজ্য স্তরে পাস হয়ে বাস্তবায়নের পথে এগোবে।
✨রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ‘দুয়ারে সরকার’ মডেল ফের চালু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আগেভাগেই ভোট বৈতরণীর সাঁতার কেটে ফেলতে চাইছেন, তাতে সন্দেহ নেই বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তবে বাস্তবায়নের গতিই বলে দেবে—‘আমাদের পাড়া’-য় সত্যিই ‘সমাধান’ পৌঁছায় কি না।











Post Comment